কথায় বলে, জীবনে সাফল্য সহজে ধরা দেয় না। তবে আপনি যদি জীবনে কিছু করবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন, কোনও প্রতিবন্ধকতাই আপনার লক্ষ্য অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। একথার জলজ্যান্ত প্রমাণ চিনু কালা। তিনি তিলে তিলে নিজেকে তৈরি করেছেন এবং তার লড়াইয়ের ফসল এখন সকলের সামনে। চিনু দেশের জনপ্রিয় ফ্যাশন জুয়েলারি ব্র্যান্ড রুবানস অ্যাকসেসরিজের ডিরেক্টর। অথচ কৈশোরে তাঁকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল। বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। সেলসগার্লের কাজ করে দিনে মোটে ২০ টাকা আয় করতেন। সেই মেয়েই এখন ১০০ কোটির জুয়েলারি ব্রান্ডের মালিক! থাকেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে, চড়েন বিএমডব্লিউ গাড়ি। কীভাবে একজন স্কুলছুট কিশোরী হয়ে উঠলেন দেশের অন্যতম নারী উদ্যোক্তা? দেখুন…
তখন চিনু কালার বয়স ১৫ বছর। ক্লাস টেনে পড়েন। পরিবারে টানাটানি। বাড়িতে নিত্য অশান্তিতে বিরক্ত চিনু নিজে কিছু রোজগারের আশা নিয়ে বাড়ি ছাড়লেন। সঙ্গে মাত্র ৩০০ টাকা, একজোড়া জুতো, দু’জোড়া জামা। আর ছিল অদম্য মনোবল ও কিছু করে দেখানোর জেদ। প্রথম দু’দিন খুব ভয়ে ভয়ে কাটালেন। কাজের সন্ধানে ঘুরলেন রাস্তায় রাস্তায়। প্রথম দুরাত ঘুমোলেন রেলস্টেশনেই। তারপর শুধুমাত্র রাতের জন্য একটি ডর্মিটরিতে থাকার সুযোগ পেলেন। সেখানে না আছে টয়লেট, না রান্নাঘর। প্রতিদিনের ভাড়া ২০ টাকা। দিনকয়েকের মধ্যে সেলসগার্লের একটা কাজ জুটে গেল। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছুরির সেট, কোস্টার ইত্যাদি বিক্রির কাজ। আয় কোনওদিন ২০ টাকা, তো কোনওদিন ৬০ টাকা। এভাবেই লোকের দরজায় দরজায় ঘুরলেন প্রায় ১ বছর। তাঁর নিষ্ঠা ও দক্ষতা দেখে কোম্পানি তাঁকে সুপারভাইজার বানিয়ে দিল।
অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন কয়েক বছর। এমনও হয়েছে সারাদিন সেলস-এর কাজ করার পর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত রেস্টুরেন্টে খাবার পরিবেশন করেছেন। পরে তিনি টাটা ইন্ডিকমে চাকরি পান। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হল বেঙ্গালুরুর ছেলে অমিত কালার সঙ্গে। ২০০৪-এ অমিতকে বিয়ে করেন চিনু। ২০০৮ সালে বন্ধুদের জোরাজুরিতে মিসেস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেন চিনু। ১০ জন ফাইনালিস্টের মধ্যে থেকেও ইংরেজিতে ঠিকমতো কথা বলতে না পারায় প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে গেলেন। এবার নামলেন মডেলিংয়ে। এখান থেকেই ফ্যাশন জুয়েলারিতে আগ্রহ জন্মাল চিনুর। ইতিমধ্যে তাঁদের একটি মেয়েও হয়েছে। ৩ লক্ষ টাকা দিয়ে শুরু করলেন মেয়ের নামে ফ্যাশন জুয়েলারির আউটলেট। নাম দিলেন রুবানস অ্যাকসেসরিজ। ব্যবসা বাড়তে লাগল। ২০১৮-তে তাঁর আউটলেটের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল পাঁচটি। এল কোভিড মহামারী। অনলাইনে গয়না বিক্রি হতে লাগল দুরন্ত গতিতে। মাত্র ৩০০ টাকা নিয়ে ঘরছাড়া চিনুর কোম্পানির এখন টার্নওভার কোটি কোটি টাকা। ২০২১-এ প্রায় ৩০ কোটি টাকা এবং ২০২২-এ ৫১ কোটি টাকা ব্যবসা করেছে তাঁর কোম্পানি৷
১৯৮১ সালে ১০ অক্টোবর রাজস্থানে জন্ম চিনুর। ৪২ বছরের চিনু ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, “প্রথম যেদিন আমি আমার বাবা-মায়ের বাড়ি ছেড়েছিলাম, আমার পকেটে মাত্র ৩০০ টাকা ছিল, আমি সত্যিই ঠিক করতে পারিনি যে সেই দিন বা সামনের দিনগুলি কীভাবে খাব এবং বেঁচে থাকব। আমি এখনও সেই খেতে না পাওয়ার দিনগুলি নিয়ে ভাবি।” অনলাইনের পাশাপাশি এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রুবানস অ্যাকসেসরিজের বেশ কয়েকটি আউটলেট রয়েছে। এখন, চিনু বেঙ্গালুরুতে ৫ হাজার বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকেন এবং একটি BMW 5 সিরিজের গাড়ি চড়েন। জীবনে সাফল্য অর্জন করা সত্ত্বেও, চিনু এখনও রুবানসকে ভারতের সবচেয়ে বড় জুয়েলারি কোম্পানিতে পরিণত করার লক্ষ্যে প্রতিদিন ১৫ ঘণ্টা করে কাজ করেন। চিনু কালা তাই আজ সকলের অনুপ্রেরণা।
