গল্পটা মোটের ওপর এইরকম। সালটা ১৯০৯। শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরার ট্রেন ধরেছিলেন বাঙালি ব্যবসায়ী অখিলচন্দ্র সেন। বেরনোর আগে স্ত্রী তাঁকে যত্ন করে ভালমন্দ খাইয়ে দেন। শেষপাতে ছিল সেনমহাশয়ের প্রিয় পাকা কাঁঠাল। লোভে লোভে অনেকখানি কাঁঠালও খেয়ে ফেলেছিলেন তিনি। এরপর স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে বিদায় জানিয়ে টাঙ্গায় চেপে রেলস্টেশনে গিয়ে পৌঁছন সেনমহাশয়। টিকিট কেটে প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চেপে বসেন সেনমহাশয়। বিপত্তি বাধে মাঝরাস্তায় এসে। পেটের মধ্যে মোচড় দিতে শুরু করেছে। ক্রমশ বেড়ে যেতে থাকে সেই গুড়গুড়ুনি। এই তো পৌঁছে যাব, বলে নিজেকেই প্রবোধ দিতে লাগলেন সেনমহাশয়। দীর্ঘক্ষণ চাপাচাপির চেষ্টা করে ঘেমেনেয়ে উঠলেন একেবারে। কিন্তু আর তো পারা যাচ্ছে না! সামনের স্টেশনে ট্রেন থামতে না থামতেই হুড়মুড় করে নেমে পড়লেন ট্রেন থেকে। একছুটে রেললাইনের অদূরে ঝোপের আড়ালে গিয়ে হালকা হওয়ার জন্য বসে পড়লেন তিনি। আহ, যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। কিন্তু ততক্ষণে হুইসল বাজিয়ে দিয়েছেন ট্রেনের গার্ড সাহেব। কোনওরকমে জলখরচ সারতে না সারতেই ট্রেন দিয়েছে ছেড়ে। সেনমহাশয় পড়িমরি করে দৌড় লাগালেন। গার্ডকে ট্রেন থামাতে অনুরোধ করলেন। কাজ হল না। এক হাতে লোটা, অন্যহাতে ধুতি। সেই অবস্থায় দৌড়তে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন প্লাটফর্মের ওপর। নাকের ডগা দিয়ে বেরিয়ে গেল ট্রেন। তাকিয়ে দেখলেন তিনি আহমেদপুর স্টেশনে। লোকজনের সামনে এইভাবে বেইজ্জত হওয়ায় রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে সেনমহাশয় সেদিন যাত্রাবিরতি করলেন।
বাড়ি ফিরলেও রেল কর্তৃপক্ষ, বিশেষত ট্রেনের গার্ডের ওপর রাগ এতটুকু পড়ল না ব্যবসায়ী মানুষ সেনমহাশয়ের। ভাবলেন প্যাসেঞ্জার ট্রেনের যাত্রীদের প্রতি এই বৈষম্যের একটা বিহিত করা দরকার। তিনি নিজেই একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বেন বলে মনস্থ করলেন। কড়া ভাষায় চিঠি লিখলেন তৎকালীন সাহেবগঞ্জ ডিভিশনাল রেলওয়ে অফিসে। সেই চিঠিতে ট্রেনের গার্ডকে মোটা অঙ্কের জরিমানা করার দাবিও জানালেন তিনি। এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা না হলে এই ঘটনার কথা খবরের কাগজে প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকিও দিলেন। সেনমহাশয় কী লিখলেন সেই চিঠিতে?

কাঁচা ইংরেজিতে লেখা হলেও সেনমহাশয়ের চিঠিখানা রেল কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করেছিলেন। কারণ, ১৯০৯-১০ সালেই দূরপাল্লার ট্রেনে সবার জন্য শৌচাগারের বন্দোবস্ত হয়। দর্শকদের জন্য জরুরি তথ্য, ১৮৫৩ সালে ভারতে রেল চলাচল শুরু হলেও দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক ট্রেনগুলিতে সর্বসাধারণের জন্য শৌচালয়ের ব্যবস্থা হয়নি। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির যাত্রীরা কেবল এই সুবিধা পেতেন। ১৮৯১ সালে তৃতীয় শ্রেণির কামরায় শৌচাগার চালু হলেও বঞ্চিত ছিলেন চতুর্থ শ্রেণির যাত্রীরা। অথচ চতুর্থ শ্রেণিতে অনেক বেশি যাত্রী যাতায়াত করতেন। অথচ রেলকর্তারা ভাবতেন, ফোর্থ ক্লাস যাত্রীরা ৫০ মাইলের বেশি সফর করবেন না, সুতরাং তাদের জন্য শৌচালয়ের প্রয়োজন নেই। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষের এই ধারণা যে কতটা ভুল ছিল, তা পত্রাঘাত করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এক বাঙালি। সেনমহাশয়ের সেই ‘বিস্ফোরক’ চিঠিটি বর্তমানে নয়াদিল্লির রেলওয়ে মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।
