Friday, April 17, 2026
Homeখবরগাছের ফল বা বীজ দিয়ে তৈরি করা হতো সিঁদুর। সিঁদুর গাছ নামে...

গাছের ফল বা বীজ দিয়ে তৈরি করা হতো সিঁদুর। সিঁদুর গাছ নামে বিখ্যাত সেই গাছকে আবার কেউ কেউ বলেন লিপস্টিক গাছ। কি এই সিঁদুর গাছ? কোথায় পাবেন এই গাছ? কিভাবেই বা এর থেকে পাওয়া যায় সিঁদুর ?

বাঙালির বিয়ে, নানা আচার অনু্ষ্ঠান এবং পুজোপার্বণে সিঁদুরের উপস্থিতি থাকবেই। বাঙালি হিন্দু মহিলাদের বেশিরভাগই সিঁথিতে সিঁদুর পরেন। যদিও ভারতের অন্যত্র মহিলাদের হলুদ বা গেরুয়া রঙের সিঁদুর পরতেও দেখা যায়। তবে সিঁদুর বললেই প্রথমে টকটকে লাল রঙের প্রসাধনীর ছবিটি মনে আসে। রক্তবর্ণ এই জিনিসটি তারা কেন ব্যবহার করেন, তা নিয়ে নানা মত ও বিতর্ক আছে। আমরা সে-কথায় যাচ্ছি না। আমাদের আলোচ্য, বাঙালি বা ভারতীয় হিন্দু মহিলাদের ব্যবহৃত এই সিঁদুরের উৎপত্তি কোথা থেকে? আসলে, আদিতে এই সিঁদুর তৈরি হত একটি গাছের ফল বা তার ফলের বীজ থেকে। তাই গাছটিকে দুই বাংলায় ‘সিঁদুর গাছ’ নামেই ডাকা হয়। আবার অনেক দেশে এর নাম ‘লিপস্টিক গাছ’। সিঁদুর প্রস্তুত করা ছাড়াও রঞ্জনী হিসেবেও এই গাছের ব্যবহার আছে।

কী এই সিঁদুর গাছ? কোথায় পাওয়া যায়? কীভাবেই বা এর থেকে সিঁদুর পাওয়া যায়? জানব। গুল্মজাতীয় এই গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘বিক্সা ওরেলানা’ (Bixa orellana)। গাছটি ‘অ্যাচিওট’ (achiote) নামেও পরিচিত। এর আদি নিবাস অবশ্য মধ্য আমেরিকায়। তবে ভারত-বাংলাদেশ সহ আমেরিকা-আফ্রিকার অনেক দেশেই জন্মায় এই সিঁদুর গাছ। তাই বোলে গাছে সিঁদুর ফলে? হ্যাঁ। এই গাছের ফল বা তার বীজ থেকে শুধু সিঁদুর তৈরি হয়, তাই নয়, এককালে এই গাছের ফলের বীজের লাল রং দিয়ে মহিলা এবং পুরুষরা তাদের ঠোঁট রাঙাতেন। বাংলায় এই ফলের রং দিয়ে দইও রং করা হত, তাই এই গাছের আর-এক নাম ‘দইগোটা’। তাছাড়াও এই ফলের বীজের কয়েকটি দানা জলে গুলে তা দিয়ে পোলাও বা বিরিয়ানিতে রং করা হয়, তাই একে অনেকে নকল জাফরানও বলেন।

সিঁদুর গাছ বহুবর্ষজীবী। গাছটি ২০ থেকে ৩৩ ফিট পর্যন্ত লম্বা পারে। মাথার দিকে ঝোপের আকার নেয়। গাছের শাখায় উজ্জ্বল সাদা বা গোলাপী রঙের ফুলের গুচ্ছ থাকে, যা বুনো গোলাপের মতো দেখায়। থোকায় থোকায় ফল হয়। ফলের গায়ে রোঁয়া থাকে। ফল ছিঁড়ে একটু চাপ দিলেই সিঁদুরকৌটোর ঢাকনার মতো খুলে যায়। প্রতিটি ফলের ভেতর ৩০ থেকে ৪৫টি শঙ্কু আকৃতির বীজ থাকে, যা একটি পাতলা মোমের রক্ত-লাল খোসা দিয়ে আবৃত থাকে। ফল পেকে শুকিয়ে গেলে দুভাগে ভাগ হয়ে যায়, বেরিয়ে পড়ে লাল রঙের দানা। দানাগুলি হাতে নিয়ে একটু ডললেই হাত রাঙা হয়ে যায়। এই যে লাল রং তা হল ‘বিক্সিন’। এর অতিরিক্ত ব্যবহারে উচ্চরক্তচাপের সৃষ্টিও হতে পারে। ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম সিঁদুর বাজারে আসার আগে এই ভেষজ সিঁদুর ব্যবহারেরই চল ছিল।

কীভাবে এই সিঁদুর গাছ ভারতে বা বাংলায় এল? আসলে, আগেকার দিনে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে নানারকম ফলের বীজ ব্যবহৃত হত। সম্ভবত, ১৬ এবং ১৭ শতাব্দীতে, বাণিজ্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে এই সিঁদুর বীজ ভারত সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার অন্যান্য অংশে বিলি করা হয়েছিল। এটি একসময় ভারত, শ্রীলঙ্কা, জাভা প্রভৃতি এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে চাষ করা হত, মূলত এর বীজ থেকে রঞ্জক পদার্থ তৈরির জন্য। ফুড কালার হিসেবে বিভিন্ন দেশে মাখন, পনির, মার্জারিন, আইসক্রিম, মাংস এবং নানা মশলাদার খাবার রং করার জন্যও সিঁদুর গাছের ফলের বীজের নির্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উত্তর, মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ মূলত বডি পেইন্ট, লিপস্টিক এবং বিশেষ মশলা তৈরিতে বীজ ব্যবহার করে থাকেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Recent Comments