পঞ্চায়েত ভোটের দিন ঘোষণার পর রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় আগেই আইনের দ্বারস্থ হয়েছে একাধিক বিরোধী দল। জোড়া জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী এবং রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর তরফে। সোমবার সকালেই ছিল শুনানির দিন। আর এদিন আদালতের তরফে মনোনয়নের দিন বাড়ানো থেকে শুরু করে ভোটের দিন বদলের সুরও শোনা গেল। এমনকী, বারবার বিরোধীদের তরফে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ভোট করার যে প্রস্তাব শোনা যাচ্ছিল, একপ্রকার তেমনটা চাইছেন খোদ কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম!
হাইকোর্টে সোমবার সকাল ১১ টায় শুরু হয়েছে পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে মামলার শুনানি। আর এদিন আদালতে হাজির থাকতে দেখা গেছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে। এদিন প্রধান বিচারপতি যা যা বললেন,তা একপ্রকার বিরোধীদের পালেই হাওয়া দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন মনোনয়নের জন্য যে সময় ধার্য করেছে, তা যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। এদিন বিজেপির আইনজীবী আদালতকে জানিয়েছেন, প্রতি দিন ৪ ঘণ্টা করে মনোনয়ন নেওয়া হচ্ছে। সেদিক থেকে ৫ দিনে হিসাব করলে ৭৩ হাজার প্রার্থীর জন্য গড়ে ৪০ সেকেন্ড সময়ও মেলে না। এত কম সময়ের মধ্যে মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্ভব নয় বলেই জানানো হয়েছে গেরুয়া শিবিরের তরফে। বিরোধী দলগুলির পালটা যুক্তি দিতে প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে কমিশনের তরফে সন্তানের স্কুলে ভর্তির উদাহরণ টানতে শোনা যায়। এদিন কমিশনের আইনজীবী বলেন, যদি কেউ তার সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করাতে যান। তখন তো সেই অভিভাবক জানেন, সন্তানকে ভর্তি করাতে কী কী নথিপত্র লাগবে। কিন্তু এর জন্য কি ওই অভিভাবক অতিরিক্ত সময় দাবি করতে পারেন স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে? যদিও মনোনয়ন নিয়ে সেই ইস্যুতে একটু নমনীয় হতে দেখা গেল কমিশনকে। মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমা এক দিন বাড়ানো যেতে পারে বলে তারা প্রধান বিচারপতিকে জানিয়েছেন। টি এস শিবজ্ঞানম এদিন এও জানিয়েছেন যে, বিজ্ঞপ্তির দিনটিকে তিনি সময়সীমার মধ্যে ধরতে চান না।
মনোনয়নের দিন বাড়ালেই চলবে না, এদিন প্রধান বিচারপতি নির্বাচনের দিন বদলের পরামর্শ দেন। এমনিতেই গত সপ্তাহে রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা জানিয়েছিলেন, ৮ জুলাই এক দফায় পঞ্চায়েত ভোট হবে। কিন্তু সোমবার মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম বলেন, মনোনয়ন থেকে দিন পিছিয়ে গেলে ভোট ১৪ জুলাই করাতে হবে। যদিও রাজ্য নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী এই প্রেক্ষিতে বললেন, দিন পিছিয়ে দেওয়া যায় না। এরপরই তিনি গতবারে ধার্য করা মনোনয়নের সময়সীমার উল্লেখ করেন। সে বার মনোনয়নের জন্য ৭ দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার তো সাতদিনও সময় দেওয়া হয়নি! বিরোধীদের তরফে উঠছে সেই প্রশ্নও। বিজ্ঞপ্তির দিনটিকে যেহেতু প্রধান বিচারপতি মনোনয়নের সময়সীমার মধ্যে ধরবেন না বলে জানিয়েছেন, সেদিক থেকেও উঠছে প্রশ্ন।
মনোনয়নের জন্য দেওয়া সময় যথেষ্ট নয়– এই অভিযোগ ছাড়াও কেন্দ্রীয় বাহিনী এনে ভোট করানোর কথা বলা হয়েছে বিরোধীদের তরফে। এদিন মনোনয়ন প্রসঙ্গে আমজনতার নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তোলেন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম। মনোনয়ন ঘিরেই অশান্তি হচ্ছে রাজ্যে, সেই কথা বলেন তিনি। এরপরই কমিশনের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেন বিচারপতি। অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট করানো কমিশনের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন তিনি। যদিও কমিশন যে সুষ্ঠুভাবে ভোট করাতে বদ্ধ পরিকর, তা জানিয়েছেন তাদের আইনজীবী।
এরপরই পঞ্চায়েত ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার প্রসঙ্গে নিজের পর্যবেক্ষণ জানান প্রধান বিচারপতি। তার কথায়, রাজ্য নিজের মতো বাহিনী দেওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করলে ভাল হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে চিন্তাভাবনা কমিশনের করা প্রয়োজন বলেই জানান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। প্রসঙ্গক্রমে হনুমান জয়ন্তীর সময় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার পরামর্শের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। সেই পরামর্শ অনুসারে কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যকে সহযোগিতা করতেও এসেছিল। একইভাবে নির্বাচনের সময়ও কমিশন চাইলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সহযোগিতা চাইতে পারে। প্রয়োজনে স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী রাখা যেতে পারে বলে পরামর্শ প্রধান বিচারপতির।
