১৯৩৭-এর তেসরা মে। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে আমেরিকার নিউ জার্সি যাচ্ছিল এয়ারশিপ ‘হিন্ডেনবার্গ’। ১৩ তলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল ‘আকাশের টাইটানিক’ হিন্ডেনবার্গে সেদিন যাত্রী ও ক্রু সহ মোট ৯৭ জন। পাঁচই মে গন্তব্যে পৌঁছনোর কথা কিন্তু একটু দেরি হয়ে যায়। ছয়ই মে নিউ জার্সিতে পৌঁছলেও, হঠাৎ আবহাওয়া বিগড়ে যাওয়ায় প্রথম দফায় বিশালাকার এয়ারশিপটি অবতরণ করতে পারেনি। কন্ট্রোল রুম পাইলটকে কিছুক্ষণের জন্য এয়ারশিপটি নিয়ে ঝড় থেকে দূরে উড়তে বলে। তখন বিশাল এয়ারশিপের অবতরণ খুবই কঠিন কাজ ছিল। আবহাওয়া পরিষ্কার হতেই অবতরণের অনুমতি পেয়ে হিন্ডেনবার্গ নিউ জার্সির ল্যান্ডিং সাইটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তেই জোরালো হাওয়া উঠল। এই পরিস্থিতিতে দুটি উপায় ছিল। প্রথমটি হল বাতাসের অভিমুখ ধরেই ধীরে ধীরে ল্যান্ডিং সাইটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা। তবে তাতে অবতরণে আরও বিলম্ব হবে। তাই পাইলট তীক্ষ্ণ বাঁক নিয়ে বাতাসের বিপরীতে অবতরণস্থলে পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নেন।
তাতেই গোল বাঁধে। জানা যায়, তীক্ষ্ণ বাঁক নেওয়ার কারণে হিন্ডেনবার্গের কিছু স্টিলের তার পিছনের অংশে ছিটকে পড়ে একটি গ্যাস চেম্বার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই গ্যাস চেম্বার থেকে হাইড্রোজেন গ্যাস বের হতে থাকে। ল্যান্ডিং সাইটে পৌঁছনোর মুখে ক্যাপ্টেন লক্ষ্য করেন যে, এয়ারশিপের পিছনের অংশটি নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অথচ অবতরণের সময় ভারসাম্য বজায় রাখা খুব জরুরি। তাই তড়িঘড়ি এয়ারশিপের পিছনের দিক থেকে ২-৩ বার জল অপসারণের নির্দেশ দেন ক্যাপ্টেন। এবং ক্রু সদস্যদের সামনের দিকে এগিয়ে আসতে বলেন, যাতে পেছনের ওজন কমিয়ে এয়ারশিপে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়। অবতরণের মুহূর্তে এয়ারশিপ থেকে কিছু দড়ি ছুড়ে দেওয়া হত, যার সাহায্যে এয়ারশিপটি টেনে নামানো যায়। সেই প্রক্রিয়ায় অবশেষে Titanic Of The Sky ল্যান্ডিং সাইটের ওপর থামে। হঠাৎ এয়ারশিপের পেছনের অংশে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তের মধ্যে হাইড্রোজেন গ্যাস ভর্তি হিন্ডেনবার্গ আগুনের গ্রাসে চলে যায়। মাত্র ৩৫ সেকেন্ডের মধ্যে সব পুড়ে ছাই।
ঝাঁপ দিয়ে এবং ঘটনাচক্রে বাঁচেন ৬২। বাকি ৩৫ জন জীবন্ত দগ্ধ হন। পালাতে না পারায় এয়ারশিপের কাছাকাছি থাকা একজন ক্রু সদস্যও প্রাণ হারান। এই দুর্ঘটনার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। এয়ারশিপটি যখন আকাশে ঝড়ের মুখোমুখি হয়, তখন বজ্রবিদ্যুতের সংস্পর্শে এসে এটি বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়ে। আগেই হাইড্রোজেন গ্যাস চেম্বার ফুটো হয়ে গিয়েছিল। সেখানে স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয় এবং প্রায় ৮০৪ ফিট লম্বা ও ১৩৫ ফুট ব্যাসের বৃহত্তম এয়ারশিপ মুহূর্তে দপ করে জ্বলে ওঠে। ১৯১২ সালের ১৪ এপ্রিল টাইটানিক তার প্রথম সমুদ্রযাত্রায় ডুবে গিয়েছিল, কিন্তু জার্মান ‘উড়ন্ত টাইটানিক’ হিন্ডেনবার্গ ৬২টি সফল উড়ানের পর ৬৩তম যাত্রায় বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনার পর কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন যে, যা দিয়ে এই এয়ারশিপগুলি উড়ছে সেই হাইড্রোজেন গ্যাস অত্যন্ত দাহ্য। তারপর এয়ারশিপের প্রতি মানুষের আস্থা কমে এবং অচিরেই গোটা এয়ারশিপ ইন্ডাস্ট্রি শেষ হয়ে যায়। হিন্ডেনবার্গ দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীরাও আজ আর নেই। তবে এই ঘটনা নিয়ে ২০০৭ সালে তৈরি হয়েছিল ‘হিন্ডেনবার্গ: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ নামে একটি চলচ্চিত্র।
