নানা দেশেই মাটির নিচে বসতি গড়ার নিদর্শন রয়েছে। তার অনেকগুলিই বেশ প্রাচীন। ভূগর্ভস্থ সেইসব ঘরবাড়িগুলি এখানকার বাসিন্দাদের সুরক্ষিত রাখত। বিশেষ করে ঝড়ঝাপটা এবং বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য দারুণ কার্যকরী ছিল মাটির নিচের এই বসতিগুলি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রায় সর্বত্রই মাটির উপরেই গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, গ্রাম, শহর। তবে আজও রয়েছে ভূগর্ভে থাকা এক গ্রাম। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায়ই নেই যে, সেখানে একটি গ্রাম রয়েছে। এমনকি উপর থেকে দেখে সেই গ্রামকে চৌকো করে কাটা কতগুলি গর্তর বেশি কিছু মনে হবে না। দেখে মনেই হবে না যে, মাটি থেকে ১৮ থেকে ২১ ফিট গভীর সেই প্রতিটি গর্তের ভেতরে বসবাস করছে বেশ কয়েকটি করে পরিবার। এমন অনেকগুলো গর্ত নিয়ে পুরো গ্রামটাই গড়ে উঠেছে মাটির তলায়! হ্যাঁ, সেই গ্রামে এরকম অন্তত ১০ হাজার ঘর রয়েছে। তবে এগুলোর বেশিরভাগই বর্তমানে পরিত্যাক্ত। সেখানে আপাতত বাস করেন কম-বেশি ৩,০০০ মানুষ। ২০০ বছরের প্রাচীন এই গ্রামের প্রতিটি বাড়ির স্থাপত্য পরিকল্পনাও এককথায় অসাধারণ।
চীনের হেনান প্রদেশের সানমেনশিয়ায় রয়েছে এই পাতাল গ্রাম। মাটির নিচে তৈরি এই ঘরগুলোকে চীনারা বলে ‘ইয়ায়োডং’, যার মানে হল গুহাঘর। সেখানে পৌঁছতে হলে ১০ মিটারেরও বেশি লম্বা টানেলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে হবে। মাটি থেকে প্রায় ৬-৭ মিটার গভীরে তৈরি গুহাঘরের দরজাগুলি চৌকোনা উঠোন বা চক লাগোয়া। ঘরগুলো লম্বায় ৩৩ থেকে ৩৯ ফিট পর্যন্ত হয়। ঘরের ভেতরে রংবাহারি কারুকাজ এবং আসবাবপত্র। চিনের পেপার-কাটিং কনটেস্টে বারবার সোনা জেতেন এখানকার বাসিন্দারা। এই গুহাঘরগুলো শীতকালে উষ্ণ এবং গ্রীষ্মে শীতল। শীতে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নামে না, আবার গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ওঠে না। তাছাড়া গুহাঘরগুলো ভূমিকম্পেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। সেখানে টয়লেট, বাথরুম, বসার ঘর, শোয়ার ঘর, এবং স্টোররুম সবই রয়েছে। রয়েছে জলের কুয়ো এবং নিকাশির ব্যবস্থাও। রয়েছে গোশালা এবং বিশেষ ধরনের রান্নাঘরও। সেই রান্নাঘরে ধারাবাহিক সাতটি উনুন থাকে। তার একদিক দিয়ে দেওয়া হয় কাঠ, আর প্রতি উনুনের তাপ অনুযায়ী খাবার রান্না হয়।
জানা গিয়েছে, একটা সময় এখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। তবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং প্রতিকূল জীবনযাত্রার চাপ সামলাতে না পেরে অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছেন। ফলে কিছু কিছু গুহাঘর পরিত্যক্ত। তা সত্ত্বেও আজও সেখানে প্রায় ৩ হাজার মানুষ বসবাস করেন, তাদের মধ্যে ৬ প্রজন্মের প্রতিনিধিও রয়েছেন। একটি গুহাঘর তৈরি করতে একটি পরিবারের দুই থেকে তিন বছর খননকার্য চালাতে হয়। ভূগর্ভস্থ এই গ্রামটি ২০১১ সাল থেকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় প্রশাসন এবং সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগসহ কিছু আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে। পাতালঘরের বাসিন্দাদের বিয়ে ও বসন্ত উৎসব হয় জাঁকজমক করে। অনুষ্ঠানে তারা ইয়াংকো নাচ, ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় অপেরা, ড্রাম ডান্স পরিবেশন করেন। ইদানীং অনেকে রোজগারের আশায় পর্যটকদের কাছে গুহাঘর ভাড়া দিচ্ছেন। এক মাসের ভাড়া ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার টাকা। চিনেরা সেই ঐতিহ্যবাহী গুহাঘর কিনতেও পারেন। একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ‘ইয়ায়োডং’-এর দাম পড়বে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২৯ লক্ষ টাকা।
